বুধবার, ৪ অগাস্ট ২০২১

আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান গুমের রহস্যভেদে সরকারের অনীহা

ঢাকা

গত বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে দুই সঙ্গীসহ নিখোঁজ রয়েছেন তরুণ ইসলামী আলোচক আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান । তার মূল নাম মো. আফছানুল আদনান।

তাঁর সঙ্গে গাড়িচালকসহ অপর দুই সঙ্গীর হদিসও মিলছে না বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই তিন দিনের বেশি পার হয়েছে।

তার স্ত্রী সাবিকুন নাহার জানান, আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান বৃহস্পতিবার দুপুরে রংপুর থেকে ঢাকায় রওনা হয়েছিলেন। রাত ২টা ৩৭ মিনিটে তার সঙ্গে শেষ কথা হয়। তিনি তখন গাবতলী ছিলেন। এরপর রাত ৩টা থেকে তার  ফোন বন্ধ পাই, এখনো পর্যন্ত নম্বর বন্ধই পাচ্ছি।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনায় রংপুর সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। তবে তার অভিযোগ এ ঘটনায় ঘটনায় রাজধানীর দারুসসালাম এবং মিরপুর থানায় গেলে কোন থানাই জিডি বা মামলা নেয়নি।

রংপুর মহানগরীর সেন্ট্রাল রোডের আহলে হাদিস মসজিদ-সংলগ্ন গলিতে তার পৈত্রিক বাসা। বিয়ের পর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে শালবন এলাকার চেয়ারম্যানের গলিতে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান। তাঁর তিন বছরের একটি মেয়ে ও দেড় বছর বসয়ী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।

আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান কেন নিখোঁজ?

আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান ‘নিখোঁজ’ হওয়ার কারণ জানা যায়নি এবং তাঁকে উদ্ধারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

এ ধরনের ‘নিখোঁজ’ হওয়ার সংবাদ কেন উদ্বেগ ও শঙ্কার জন্ম দেয়, তা সবিস্তারে বলা দরকার নেই। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে এ ধরনের ‘নিখোঁজ’ ব্যক্তিরা আসলে যার শিকার হন, তাকে গুম ভিন্ন আর কিছু বলার সুযোগ নেই।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে সব সময় এ দাবি করা হয়ে থাকে যে বাংলাদেশে কোনো ধরনের গুমের ঘটনাই ঘটে না, কিন্তু দেশের এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো জোর দিয়ে বলে আসছে, বাংলাদেশে গুমের ঘটনা অব্যাহত।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের হিসাবে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১১ জন গুম হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

গত বছরের আগস্ট মাসে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য ছিল, গত ১৩ বছরে বাংলাদেশে ৬০৪ জন গুমের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৭৮ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। ৮৯ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং ৫৭ জন কোনো না কোনোভাবে ফিরে এসেছেন।

এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (এএইচআরসি) বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত গুম হওয়া ৫৩২ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে। কে কীভাবে গুম হয়েছিলেন, তারও বিস্তারিত সেখানে আছে। এ সংখ্যা যে বেড়েছে, তা আমরা তো দেখতে পাচ্ছি।

গুমের রহস্যভেদে সরকারের অনীহা

এসব গুমের বিষয়ে সরকারের কাছে আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা অনুরোধ জানালে সরকার তার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না।

জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির সর্বসাম্প্রতিক নথিতে দেখা যায়, বাংলাদেশে ৬১ জনের গুম-রহস্যের এখনো কোনো কিনারা হয়নি। এর মধ্যে কমিটি সরকারের কাছে পাঁচজনের গুমের বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে তথ্য জানতে চেয়েছে।

গুমের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ার কারণে এ কমিটি ২০১১ সালের ৪ মে, ২০১৬ সালের ৯ মার্চ, ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এবং গত ২৯ জুন উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে। কমিটি ২০১৩ সালের ১২ মার্চ আলাদা চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানোর অনুরোধও জানিয়েছে। ওই অনুরোধের বিষয়ে তারা আরও পাঁচবার সরকারকে চিঠি লিখলেও সরকার তাদের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

অথচ ২০১৯ সালের এপ্রিলে ফ্রান্সভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (এফআইডিএইচ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, গুমের এ ঘটনাগুলো বিক্ষিপ্ত বা স্বেচ্ছায় ঘটানো ঘটনা নয়। ‘এগুলো যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তাঁদের সমন্বিত কৌশল কার্যকরেরই অংশ।’ এ ঘটনাগুলোকে ‘নিয়মতান্ত্রিক’ ও ‘রাষ্ট্রীয় নীতিমালার পরিণাম’ হিসেবে বর্ণনা করে এফআইডিএইচ বলেছে, ‘যেহেতু বেশির ভাগ ভুক্তভোগীকেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে টার্গেট করা হয়, এই কাজগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ।’ সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এসব অভিযোগ মিথ্যা হলে তা প্রমাণ করার জন্যই তদন্তের অনুমোদন দেওয়া।

আদালতে ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গুমের বিষয়ে তিনটি রিট করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তিনটি রুল জারি করেছেন। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। ফলে এই রিটগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি। শেষ রিট আবেদনেরও সাত বছর পার হয়ে গেছে। আদালত ভেবে দেখতে পারেন, এগুলোর ব্যাপারে তাঁর কিছু করণীয় আছে কি না।

বিজ্ঞাপন

থেকে আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন