জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিব্বত হল আজও হাজী সেলিমের দখলে

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিব্বত হল আজও হাজী সেলিমের দখলে
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিব্বত হল

পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীর ওয়াইজঘাটের ৮ ও ৯ নম্বর জিএল পার্থ লেনে ৮ দশমিক ৮৮৯ কাঠা জমির ওপর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিব্বত হল আজও স্থানীয় এমপি হাজী সেলিমের দখলে।

জগন্নাথের ছাত্রদের দফায় দফায় আন্দোলন ও সরকারের উপর মহলের আশ্বাসের পরও হাজী সেলিমের কাছ থেকে হলটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিব্বত হল থেকে গুলশান আরা সিটি মার্কেট!

সব বাধা উপেক্ষা করে ২০০১ সালে তিনি হলটির অবকাঠামো বদলে ফেলে ১০তলা বিশাল ভবন নির্মাণ করে স্ত্রীর নামে ‘গুলশান আরা সিটি মার্কেট’ গড়ে তোলেন।

এই মার্কেটে প্রায় এক হাজার দোকান ঘর রয়েছে। জগন্নাথের বেদখল হয়ে যাওয়া প্রায় ১১টি হলের মধ্যে তিব্বত হল একটি।

এসব হল উদ্ধারে দফায় দফায় জগন্নাথের ছাত্ররা আন্দোলন গড়ে তুললেও ২০১৪ সালে সপ্তাহব্যাপী সবচেয়ে বড় আন্দোলনের পরও কাজের কাজ কিছু হয়নি।

বরং গুণ্ডাবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে মারধর করে ছাত্র আন্দোলন নস্যাৎ করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের সভাপতি অধ্যাপক ড. জাকারিয়া মিয়া বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় বেদখল হওয়া হল উদ্ধারে আন্দোলন করেছেন।

সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে আশ্বাসও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে তা সম্ভব হয়নি।

যেহেতু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এখনও অনাবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়, তাই সরকারের উচিত এ জায়গা উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করে ছাত্রদের আবাসিক ব্যবস্থা করে দেয়া।

হল উদ্ধার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এফএম শরীফুল ইসলাম বলেন, ২০১৪ সালে যখন আমাদের হল উদ্ধার আন্দোলন তীব্র, তখন সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হল উদ্ধার কমিটি গঠন করা হয়।

এদিকে ২০০৬ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে হাজী সেলিম ‘গুলশান আরা সিটি মার্কেট’-এর অবকাঠামো পরিবর্তন করে দোকান হিসেবে পজিশন বিক্রি করে দেন।

তখন হল উদ্ধার আন্দোলনে হাজার হাজার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমাদের মুখোমুখি হতে হয়। তাই আমরা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পেরে উঠতে পারিনি।

জানা যায়, ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অর্পিত সম্পত্তি শাখার (স্মারক জেপ্রঢা/অর্পিত/১১৮৩) তথ্য অনুযায়ী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেদখলকৃত হলগুলোর মধ্যে ‘তিব্বত হল’ একটি।

২০০৯ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ তিব্বত হলটি উদ্ধারে সহযোগিতা চেয়ে চিঠি পাঠায়।

ওই চিঠিতে প্রায় ১৪ হাজার বর্গফুটের যে খালি জায়গাটি (তিব্বত হল) অবৈধ দখলদার কর্তৃক ব্যবহৃত হচ্ছে, প্রশাসনের সহযোগিতায় তাদের উচ্ছেদ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ করা হয়।

কিন্তু আজও প্রশাসনের পক্ষে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

তবে হাজী সেলিম তিব্বত হলের পুরনো ভবন ভেঙে নতুন করে গড়ে তুললেও ২০১১ সাল পর্যন্ত ‘তিব্বত হল’ লেখা সাইনবোর্ডটি ছিল।

বেদখলকৃত হলসমূহে ১৯৮৫ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বসবাস করে আসছিলেন

জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ) বেদখলকৃত হলসমূহে ১৯৮৫ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বসবাস করে আসছিলেন।

ওই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি আরমানিটোলায় স্থানীয়দের সঙ্গে শহীদ আবদুর রহমান হলের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের পর তিনটি বাদে বাকি হলগুলো বন্ধ করে দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এর মধ্যে পাটুয়াটুলীর ওয়াইজঘাট ৮ ও ৯ নম্বর জিএল পার্থ লেনের ‘তিব্বত হল’ একটি। শিক্ষার্থীরা নব্বইয়ের দশকে একবার হলটি ফেরত নিতে গেলে স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়।

একপর্যায়ে স্থানীয়রা ওই ভবনের দোতলায় আগুন দিলে তখনকার অধ্যক্ষ ড. হাবিবুর রহমান শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনেন।

পার্থ লেনের বিভিন্ন স্থানে ২০১১ সাল পর্যন্ত ‘তিব্বত হল’ লেখা সাইনবোর্ড দেখা গেলেও শিক্ষার্থীরা আর সেখানে ফিরতে পারেননি।

সর্বশেষ ২০১৪ সালে জগন্নাথের শিক্ষার্থীরা হলটি ‘ঘেরাওয়ে’ গেলে হাজী সেলিমের সমর্থকরা হামলা করে এবং পুলিশ লাঠিপেটা ও গুলি করে। ওইদিন ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দীন গুলিবিদ্ধসহ তিন শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।

এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের হল উদ্ধার আন্দোলনে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫ অনুযায়ী বিলুপ্ত কলেজের সব সম্পত্তি বুঝিয়ে দিতে মুসিহ মুহিত অডিট ফার্মকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল উদ্ধারের জন্য একটি প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়া হয়েছে

ফার্মটির অনুসন্ধানে দেখা যায়, তৎকালীন কলেজের অনেক হল বেদখলে ছিল, এর মধ্যে তিব্বত হল অন্যতম।

হল উদ্ধার কমিটির আহ্বায়ক জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল উদ্ধারের জন্য একটি প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। কয়েকটি হল উদ্ধারও হয়েছিল।

কিন্তু পরে এ বিষয়ে কোনো খোঁজখবর না রাখায় হলগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গুলশান আরা সিটি মার্কেটের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হাজী মো. মজিবুর রহমান হলটি তাদের বলে দাবি করে বলেন, মার্কেটটি কখনও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল না।

এটি যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছিল না, এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের সে সময়ে একটি চিঠিও দিয়েছেন।

হাফিজ নামে পাটুয়াটুলী একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের ছাত্ররা তিব্বত হলে থাকত। কিন্তু এখন সেটি বেদখলে রয়েছে।

যেহেতু এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জায়গা, সরকারের উচিত এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করে দেয়া।