ডিজিটাল ঈদের যুগে ফিরে দেখা সেকালের ঈদকে

মুসলিম ধর্ম অনুসারী ঈদের আনন্দের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে।  কারণ ঈদ মানে আনন্দ উৎসব।  ধর্ম-বর্ণ-গোত্র সকল বিভেদ ভুলে এক কাতারে শামিল হয়ে সবাই আনন্দকে ভাগ করে নেন।  সুপ্রাচীন কাল থেকে আমরা আমাদের নিজস্ব ধারায় ঈদ উদযাপন করে আসছি।  আমাদের যেমন রয়েছে  ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান,  তেমনি রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি।

ঈদের আনন্দ কি সব সময় একই রকম ছিল?  এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখি,  মুসলমানদের সবচেয়ে বড় আনন্দ উৎসবে কখনোই আনন্দের কমতি ছিল না।  তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঈদের আনন্দ উদযাপনের পদ্ধতি বদলে গেছে।  যেহেতু পদ্ধতি বদলে গেছে তাই আনন্দ এবং এর বৈচিত্রতাও বদলে গেছে।

একটা সময় ঈদকার্ডের ব্যাপক প্রচলন ছিল।  প্রায় সবাই যার যার অবস্থান থেকে আপনজনদেরকে ঈদ কার্ড উপহার হিসেবে প্রদান করত।  নানা রঙের,  নানা আকারের,  এবং নানা ডিজাইনের ঈদ কার্ড পাওয়া যেত।  কোন কোন কার্ডে আবার মিউজিক বেজে উঠতো।  ফ্লিপকার্ট সংগ্রহ এবং বিতরনের এক অভূতপূর্ণ অনুভূতি ছিল।  এমন কি প্রতিযোগিতা হতো কার  ঈদ কার্ড কত সুন্দর।  কে কত সুন্দর ভাবে লিখে ঈদ কার্ড আরেকজনকে উপহার  হিসাবে দিত।  এখন ডিজিটাল সময়ের সাথে সাথে বদলেছে ঈদ কার্ডের ধরনটাও। সময়ের সাথে সাথে ঈদ কার্ডের প্রচলন অনেকটাই কমে গেছে। ঈদ কার্ডের প্রচলনটা এখন শুধু অতীত বলা যায়। কারণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঈদ শুভেচ্ছা পাঠানো ছাড়া এখন আর ঈদ কার্ডের প্রয়োজনীয়তা নেই বললেই চলে। এর জায়গা দখল করে নিয়েছে ইন্টারনেট।  আরো সুচারুভাবে বলতে গেলে,  সোশ্যাল মিডিয়া।  সোশ্যাল মিডিয়া  ব্যবহারের বৃদ্ধির সহজলভ্যতা এবং  ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় সবাই সোশ্যাল মিডিয়াতে ঈদের শুভেচ্ছা আদান-প্রদান করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।

একটা সময় রেডিমেড গার্মেন্টসের এত দাপট ছিল না।  থান কাপড় কিনে খলিফা(টেইলার) দিয়ে সে কাপড় সেলাই করিয়ে  নেয়া হতো। ঈদের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই কাপড় কেনার জন্য তাড়াহুড়ো আবার সে কাপড় সরানোর জন্য তারাগুলো লেগে যেত।  এখন অবশ্য রেডিমেড গার্মেন্টস এর প্রভাবে এর চাহিদা ও কিছুটা কমেছে।  বড় বড় শপিং মল,  আর বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আগ্রাসী  বিপণন ব্যবস্থার কারণে মানুষ এখন রেডিমেড গার্মেন্টসের উপরই বেশিরভাগ নির্ভরশীল।  তাছাড়া সময়ের একটি বিষয় এর সাথে জড়িত।

সেকালে এবং একাল ঈদ উদযাপনের সবচেয়ে বড় যে পার্থক্যটি এখন লক্ষ্য করা যায় তা হচ্ছে  ভার্চুয়াল যোগাযোগ ব্যবস্থা।  সকালে ঈদের নামাজ শেষ করে  বেশিরভাগই বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশী ঘরে বেড়াতে যেত।  যেহেতু এই সময় টেলিফোন, মোবাইল ফোন,  ইন্টারনেট ছিল না  তাই বাস্তবিক যোগাযোগের বিষয়টি অধিক প্রাধান্য পেত।  বন্ধুর সাথে কখন দেখা হবে এই বিষয়ে মন উতলা হয়ে থাকতো।  অনেকদিন পর হয়তো কোন এক আত্মীয়র বাড়ি হঠাৎ করে উপস্থিত হয়ে চমকে দেয়া যেত।  ছিল না সেলফি নামক যন্ত্রণা।  ছিল না সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড করার দুশ্চিন্তা।  প্রাণবন্ত ও আন্তরিক ভালোবাসা।  ছিল অফুরন্ত সময়।  আর এখন সোশ্যাল মিডিয়াতে ছবি স্ট্যাটাস পোস্ট করার পেছনে একটি বড় সময় এবং মনোযোগ করা হয়।  কে কোথায় যাচ্ছে কি করছে তা মুহূর্তের মধ্যেই জেনে যাওয়ার কারণে সারপ্রাইজ বিষয়টি আর  থাকছে না।  টেলিভিশনের অবিরাম ঈদের অনুষ্ঠান আমাদের বাস্তবিক যোগাযোগকে আরো সীমিত করে এনেছে।

এতো পরিবর্তনের পরও ঈদ এখনো বাঙালির জীবনে আসে সৌহাদ্য, সম্প্রীতি ও আনন্দের বার্তা নিয়ে। আগের মতো আজকের ঈদ মানুষকে সব হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে মিলেমিশে নতুন যাত্রা শুরু করার উৎসাহ যোগায়।

ঈদ বয়ে আনুক সবার জীবনে অনাবিল আনন্দ, সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি। বর্ণিল সাজে সাজুক প্রতিটি ঘর, পথ ঘাট ও নগর বন্দর। সবাইকে ঈদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা। ঈদের আনন্দের মতো প্রতিটি মুহূর্ত অনুরূপ আনন্দিত হােক সকলের জীবনে। এই শুভ কামনা রইলো।