Monday, 12 April - 2021
Monday, 12 April 2021

পিলখানা ট্র্যাজেডি : পূর্ণ হলো এক যুগ, যা ঘটেছিল সেদিন

পিলখানা ট্র্যাজেডি আজ ১২ বছর পূর্ণ হলো। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির সকালটা শুরু হয়েছিল অন্য দিনগুলোর মতোই। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর হওয়ার আগেই হঠাৎ ভারী অস্ত্র আর বুলেটের গর্জনে কেঁপে ওঠে পিলখানা।

পিলখানার ভেতর থেকে ভেসে আসা গুলির শব্দে রীতিমতো কাঁপন ধরে নগরবাসীর হৃদয়ে।

রাইফেলস সপ্তাহ ঘিরে গোটা পিলখানায় সেদিন উৎসবের আমেজ চলছিল। কিন্তু ওই উৎসবের আড়ালে ষড়যন্ত্রের ছকে ঘাতকের দল শুরু করে ভয়াবহ নৃশংসতা।

পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তরে ২৪ ফেব্র“য়ারি তিন দিনব্যাপী রাইফেলস সপ্তাহের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৫ ফেব্রুয়ারি ছিল বর্ণাঢ্য ওই আয়োজনের দ্বিতীয় দিন। রাইফেল্স সপ্তাহ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২৬ ফেব্র“য়ারি। কিন্তু এর আগেই শুরু হয় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ।

যথারীতি ২৫ ফেব্র“য়ারি সকাল ৯টায় বার্ষিক দরবার বসে পিলখানায় দরবার হলে। সারা দেশ থেকে আসা বিডিআরের জওয়ান, জেসিও, এনসিওসহ বিপুলসংখ্যক সদস্যে তখন দরবার হল পরিপূর্ণ। হলের মঞ্চে ছিলেন তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, উপমহাপরিচালক (ডিডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এমএ বারী, বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তাসহ বিডিআরের নানা পদের সদস্যরা। সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে, ওইদিন দরবারে উপস্থিত ছিলেন ২ হাজার ৫৬০ জন।

দরবার শুরুর পর এক আনন্দঘন পরিবেশে বক্তব্য দিচ্ছিলেন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ। মহাপরিচালকের বক্তব্য চলাকালে সকাল ৯টা ২৬ মিনিটে মঞ্চের বাঁ দিকের পেছন থেকে দুজন বিদ্রোহী জওয়ান অতর্কিতে মঞ্চে প্রবেশ করেন। মহাপরিচালকের সামনে নানা দাবি নিয়ে তারা শুরু করে চিৎকার-চেঁচামেচি। ডিজির সামনে বন্দুকের নল তাক্ করে সিপাহি মঈন। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে এ ঘাতক গুলি চালাতে না পারলেও অপর জওয়ানরা ছুড়তে শুরু করে এলোপাতাড়ি গুলি। শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ। দরবার হলের বাইরে থেকেও গুলির আওয়াজ ভেসে আসছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে লাল-সবুজ রঙের কাপড় দিয়ে নাক-মুখ বাঁধা বিদ্রোহী জওয়ানরা দরবার হল ঘিরে গুলি শুরু করেন। তারা বৃষ্টির মতো গুলি করতে থাকে।

তারা অস্ত্রাগারটিও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিদ্রোহীরা কর্মকর্তাদের দরবার হল থেকে সারিবদ্ধভাবে বের করে আনেন। ডিজির নেতৃত্বে কর্মকর্তারা দরবার হলের বাইরে পা রাখামাত্র মুখে কাপড় ও মাথায় হলুদ রঙের হেলমেট পরা চারজন ডিজিকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করেন। ডিজির পর হত্যা করা হয় আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে। একের পর এক গোলাবারুদ আর গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে পিলখানাকে। নারকীয় হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে বিপথগামী বিদ্রোহীরা। মুহূর্তের মধ্যেই দেশের অন্যান্য বিডিআর ব্যাটালিয়নেও ছড়িয়ে পড়ে সেই বিদ্রোহ।

পিলখানার ভেতরে ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাভার ও ঢাকা সেনানিবাস থেকে সেনা সদস্যরা ভারী অস্ত্র এবং সাঁজোয়া যান নিয়ে এসে সকাল ১১টার দিকে ধানমণ্ডি ও নীলক্ষেত মোড়ে পৌঁছে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেন। এক পর্যায়ে বিদ্রোহীরা সদর গেট ও ৩ নম্বর গেট থেকে সেনাসদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে বিদ্রোহীদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়ে লিফলেট ছাড়া হলে ওই হেলিকপ্টারকে লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়ে বিদ্রোহীরা। এ অবস্থায় বড় ধরনের রক্তপাতের আশঙ্কায় গোটা রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। সন্ধ্যায় পিলখানার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের লাশ মাটিতে পুঁতে ও সরিয়ে ফেলা হয়।

এদিকে বিদ্রোহ সামাল দিতে শুরু হয় তৎপরতা। বিদ্রোহ শুরুর পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তার বাসভবনে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদ ও বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। মাঠপর্যায়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে মধ্যস্থতা বৈঠক চলতে থাকে ধানমণ্ডির আম্বালা ইন-এ। বিদ্রোহ দমনে নানাভাবে দফায় দফায় বৈঠক করেন তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তারা ছুটে যান পিলখানায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে চালিয়ে যান প্রাণপণ চেষ্টা।

২৬ ফেব্র“য়ারি বেলা আড়াইটায় টেলিভিশন ও বেতারে প্রচারিত জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্রোহীদের অস্ত্র সমর্পণ করে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। এরপর বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। অস্ত্র সমর্পণের পর সিভিল পোশাকে পালিয়ে যান অধিকাংশ বিদ্রোহী। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনী পিলখানার নিয়ন্ত্রণ নেয়। অবসান হয় ৩৬ ঘণ্টার বিদ্রোহের। তবে এ ঘটনায় প্রাণ হারান ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন। দীর্ঘ ১২ বছরেও ওই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি নিহতদের স্বজনরা।

এ ঘটনার মামলায় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ১৫২ জন বিডিআর সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং ২৭৮ জনকে খালাস দিয়ে রায় দেন বিচারিক আদালত।

ওই রায়ের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন। গত বছরের ৮ জানুয়ারি ২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠার হাইকোর্টের রায় প্রকাশ হয়। বিচারিক আদালতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিতদের মধ্যে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড হাইকোর্টে বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া একজন মারা গেছেন।

বাকি ১২ জনের মধ্যে আটজনের সর্বোচ্চ সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন ও অন্য চারজনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে ১৮৫ জনকে। তার মধ্যে একজন মৃত্যুবরণ করেছেন। ১৩ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন দুজনকে। ১৫৭ জনকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন। এর মধ্যে দুজন মারা গেছেন। ১৩ জনকে সাত বছর ও ১৪ জনকে তিন বছর ও এক বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে দুজনকে। মোট ৫৫২ জনকে সাজা এবং ২৮৩ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। মোট মারা গেছেন ১৪ জন।

বিজিবির কর্মসূচি : বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, হত্যাকাণ্ডে শহিদ ব্যক্তিদের স্মরণে বৃহস্পতিবার পিলখানার বিজিবি সদর দপ্তরসহ সব রিজিয়ন, প্রতিষ্ঠান, সেক্টর ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় খতমে কোরআন, বিজিবির সব মসজিদ এবং বিওপি পর্যায়ে শহিদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় এদিন সকাল ৯টায় বনানী সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান (সম্মিলিতভাবে), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব এবং বিজিবি মহাপরিচালক (একত্রে) শহিদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।

এছাড়া দিবসটি পালন উপলক্ষে বিজিবির সব স্থাপনায় বিজিবি পতাকা অর্ধনমিত থাকবে এবং বিজিবির সব সদস্য কালো ব্যাজ পরিধান করবে। শুক্রবার বাদ জুমা পিলখানার বিজিবি কেন্দ্রীয় মসজিদ, ঢাকা সেক্টর মসজিদ এবং বর্ডার গার্ড হাসপাতাল মসজিদে শহিদদের আ ত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল হবে। বিজিবি কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।